সোহাগপুর গণহত্যা দিবস পালিত

সোহাগী আক্তার | প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২১ ১৭:৪৫; আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২১ ১৭:৪৮

ছবিঃ সংগৃহীত

আজ (২৫ জুলাই) নালিতাবাড়ীর ঐতিহাসিক সোহাগপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল নালিতাবাড়ী উপজেলার কাঁকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রামে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা এদিন ভারত সীমান্তঘেঁষা ওই গ্রামের সব পুরুষ মানুষকে হত্যা করে।

একটি গুলি খুব কষ্টে বের করলে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত বের হতে শুরু করে। তারপর শাড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করি। তাতেও কাজ না হলে ঘর থেকে মশারি খুলে শরীরে ব্যবহার করি। এরপর মইয়ের ওপর শুইয়ে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার সময় সেখানেই তিনি মারা যান।- জাবেদা বেওয়া

প্রতি বছরের মতো এবারও দিনটি উদযাপন করতে স্মৃতি স্তম্ভে পুস্পস্তবক অর্পণ ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসময় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিধবা মায়েদেরকে সাথে নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্চিতা বিশ্বাস। এছাড়াও অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রেসক্লাব সভাপতি হাকাম হীরা, কাকরকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল্লাহ তালুকদার মুকুল প্রমুখ।

উল্লেখ্য, স্মৃতিবিজরিত সোহাগপুর বিধবা পল্লীতে ‘সোহাগপুর স্মৃতি সৌধ’ এর ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করা হয়েছে। গত ১৫ জুন জেলা প্রশাসক এই ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, সেদিন দেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় ৬ ঘণ্টা ধরে চলে তাণ্ডব। এ সময় গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ১৮৭ জন পুরুষকে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। সে ঘটনায় পাকিস্তানি হায়েনাদের নির্যাতনে সম্ভ্রম হারান অনেকে এবং বিধবা হন ৬৪ জন নারী। সেই ভয়াল দিনের কথা মনে করে এখনো কান্না করেন সোহাগপুরের বিধবাপল্লীর (বর্তমান নাম বীরকন্যা পল্লী) বীরাঙ্গনা ও বিধবা নারীরা।

জানা যায়, বৃহত্তর ময়মনসিংহের তৎকালীন আলবদর কমান্ডার জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের প্রত্যক্ষ মদদে ও স্থানীয় রাজাকার কাদের ডাক্তারের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই ঘটে সেই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। সেদিন ওই গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়েছেন এমন সংবাদের ভিত্তিতে রাজাকার আলবদরদের সহায়তায় ১৫০ জনের পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী স্থানীয় প্রফুল্লের দিঘি থেকে সাধুর আশ্রম পর্যন্ত এলাকা ঘিরে ফেলে। হায়েনার দল অর্ধ দিনব্যাপী তান্ডব চালিয়ে খুঁজতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ও তাদের আশ্রয়দাতাদের। ওই সময় প্রাণের মায়া ত্যাগ করে সামনের দিকে এগিয়ে যান স্থানীয় কৃষক আলী হোসেন ও জমির আলী। কিন্তু তারা বেশীদূর এগুতে পারেননি। এক রাজাকার গুলি করে দু’জনকেই হত্যা করে। এরপর শুরু হয় নারকীয় তান্ডব। মাঠে কর্মরত রমেন রিছিল, চটপাথাং ও সিরিল গাব্রিয়েল নামে ৩ গারো আদিবাসীকে হত্যা করে। তারপর একে একে হত্যা করে আনসার আলী, লতিফ মিয়া, ছফর উদ্দিন, শহর আলী, হযরত আলী, রিয়াজ আহমেদ, রহম আলী, সাহেব আলী, বাবর আলী, উমেদ আলী, আছমত আলী, মহেজ উদ্দিন, সিরাজ আলী, পিতা-পুত্র আবুল হোসেনসহ প্রায় ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষ মানুষকে। একইসাথে ওইসময় হায়েনাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন ১৩ জন নারী। সেদিন কলাপাতা, ছেড়া শাড়ী আর মশারী দিয়ে কাফন পড়িয়ে ৪/৫ টি করে লাশ এক একটি কবরে দাফন করা হয়েছিল। আবার কোন কোন কবরে ৭/৮টি করে লাশও এক সাথে কবর দেওয়া হয়েছিল। ওই নারকীয় হত্যাকান্ডের জীবন্ত স্বাক্ষী রয়েছেন অনেকেই। সেদিন সোহাগপুর গ্রামের সকল পুরুষ মানুষকে হত্যা করায় পরবর্তীতে ওই গ্রামের নাম হয় ‘বিধবা পল্লী’।

বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জবেদা বেওয়া বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই সকালে আমার স্বামী জমিতে হালচাষ করছিল। সেখানে পাকবাহিনীর গুলি খেয়ে আহত অবস্থায় প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে লুকায়। সে ঘরে যে কয়জন লুকিয়েছিল সবাইকে পাকবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

জবেদা আরও বলেন, চারদিকে লাশের মাঝে আমি যখন আমার স্বামীকে খুঁজতেছিলাম তখন প্রতিবেশী একজন আমাকে জানায়, আমার স্বামী মুমূর্ষু অবস্থায় আহত হয়ে ধান খেতে পড়ে আছে। এরপর অনেক কষ্টে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসি। বুকের কয়েক জায়গায় তার গুলি লেগেছিল। একটি গুলি খুব কষ্টে বের করলে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত বের হতে শুরু করে। তারপর শাড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করি। তাতেও কাজ না হলে ঘর থেকে মশারি খুলে শরীরে ব্যবহার করি। এরপর মইয়ের ওপর শুইয়ে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার সময় সেখানেই তিনি মারা যান।

বীরাঙ্গনা মহিরন বেওয়া বলেন, দিনটি শ্রাবণ মাসের ১০ তারিখ ছিল। পাকবাহিনী এলাকায় ঢুকে আমার শ্বশুর, স্বামী, ভাই, চাচা সবাইকে গুলি করে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে রাইফেলের সামনে চাকু (বেয়নেট) দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্ত বের করে। এরপর দেশের অবস্থা আরও খারাপ হয়। আমার শাশুড়ি এদিক সেদিক ঘুরে শাকসবজি আনতো। সেগুলো আমিসহ আমার চার ননদ কোনোমতো রান্না করে খেতাম। সে দিনগুলোর কথা আমরা মনে করতে চাই না। কারণ এ রকম ভয়াল দিন যেন কোনো মানুষের জীবনে না আসে।

বিধবা হাফিজা বেওয়া বলেন, 'স্বামী-স্বজনগরে মাইরা হালানির পরে আমরা ভিক্ষা কইরাও খাইছি। শেখ হাসিনা, মতিয়া চৌধুরী আমগরে লাইগা অনেক করছে। মুক্তিযোদ্ধার পদবি পাইছি। ভাতা পাইতাছি। পাক্কাঘরে শান্তীতে ঘুমাইতাছি। আমগরে চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু নাই। শুধু দুয়া করি হাসিনারে আল্লাহ-মাবুদ বাঁচায়া রাখুক।'

এদিকে বীরকন্যাপল্লীর সদস্যদের জীবনের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য, সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার নুরুল ইসলাম হিরু বলেন, ২ দফায় সোহাগপুর বীরকন্যাপল্লীর ১৪ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেবার পরও আরও কয়েকজন অপেক্ষমাণ রয়েছেন। তাদেরকেও একই আওতায় আনা প্রয়োজন।





এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top