শেরপুর মুক্ত দিবস আজ।

সোহাগী আক্তার | প্রকাশিত: ৭ ডিসেম্বর ২০২০ ১৩:৫২; আপডেট: ৭ ডিসেম্বর ২০২০ ১৩:৫৪

প্রতীকী ছবি

আজ ৭ ডিসেম্বর, শেরপুর পাক হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে মিত্রবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা শেরপুর অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করেন। সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এই জনপদে ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক প্রয়াত জগজিৎ সিং অরোরা শেরপুর শহীদ দারোগ আলী মাঠে এক সংবর্ধনা সভায় শেরপুরকে শত্রুমুক্ত বলে ঘোষণা দেন। এ সংবর্ধনা সভায় মুক্ত শেরপুরে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে মুক্তির আনন্দে উচ্ছ্বসিত মুক্তিযোদ্ধা-জনতার ঢল নামে শহরের পাড়া মহল্লায়ও চলে খণ্ড খন্ড আনন্দ মিছিল। মুক্তির আনন্দে জয় বাংলা স্লোগানে ফেটে পড়েন গোটা জেলার মানুষ।

স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসে বর্তমান জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৩০-৪০ টি খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এসব যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে ৫৯ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাক হানাদারদের নির্মমতার শিকার হয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে ১৮৭ জন, শেরপুর সদর উপজেলার সূর্যদী গ্রামে ৩৯ জন এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার জগৎপুর গ্রামে ৪১ জনসহ মুক্তিকামী বহু মানুষ শহীদ হন। ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী ব্যাপক শেলিংয়ের মাধ্যমে শেরপুর শহরে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলে ঘাঁটি। ঝিনাইগাতী উপজেলার আহম্মদনগর উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্নস্থানে গড়ে তোলা ঘাঁটিতে চলে নরকীয় হত্যাযজ্ঞ। এসব ঘাঁটিতে রাজাকার, আলবদর আর দালালের যোগসাজসে হানাদাররা চালাতে থাকে নরহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের মতো নৃশংস ঘটনা। অন্যদিকে স্বল্প সময়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা আঘাত হানতে শুরু করে শত্রু শিবিরে। শেরপুর মুক্ত হওয়ার আগে পাক হানাদারদের সঙ্গে যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল এমন উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান হলো- শেরপুর কাটাখালি ব্রীজ ধ্বংসের পরে রাঙামাটি গ্রাম, সূর্যদী, নালিতাবাড়ী, নাচনমহুরী, নকশী, শ্রীবরদী, কর্ণঝোরা, কামালপুর, টিকারবান্দা, নারায়নখোলা, বড়ইতার, নকলা উল্লেখযোগ্য। নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ জেলায় শত্রু সেনাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে। ১১ নং সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল তাহের বেশ কয়েকবার কামালপুর দুর্গ আক্রমণ চালান। কিন্তু শক্ত ঘাঁটি হওয়ায় পাক সেনাকে টলাতে পারেনি। অবশেষ চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ১৮ নভেম্বর। পরিকল্পনা অনুসারে ২ ডিসেম্বর রাতে অবরোধের মাধ্যমে চূড়ান্ত আঘাত হানা হয় কামালপুর ঘাঁটিতে। ১১ দিনে অবরোধের থাকার পর ৪ ডিসেম্বর এ ঘাঁটির পতন হয়।

মোট ২২০ জন পাকসেনা এবং বিপুল অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। কামালপুর মুক্ত হওয়ার পর হানাদার বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধারা মিত্র বাহিনীর সহায়তায় শেরপুর হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। কামালপুর দুর্গ দখল হওয়ার পর প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাক বাহিনীর সকল ক্যাম্প ধ্বংস হয়ে যায়। ৪ ডিসেম্বর কামালপুরের ১১ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধােদের মুর্হুমুহু আক্রমণ ও গুলি বর্ষণের মুখে স্থানীয় পাক সেনারা পিছু হটে। ৩ ডিসেম্বর শ্রীবরদী, নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী সীমান্ত ঘাঁটিতে মুক্তিবাহিনীর ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে হানাদাররা দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা তাদের ঘাঁটিগুলোতে রাজাকার-আলবদরদের রেখে দ্রুত পিছু হটতে থাকে জামালপুরের দিকে। তাই অনেকটা বিনা বাঁধায় ঝিনাইগাতী উপজেলা ৪ ডিসেম্বর ও শ্রীবরদী ৬ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয়। নালিতাবাড়ীতে টাকা দু'দিন যুদ্ধের পর বীর মুক্তিযুদ্ধোরা বিজয়ের বেশে নালিতাবাড়ী ও শেরপুর প্রবেশ করে। আরও একদিন পর ৮ ডিসেম্বর প্রবেশ করে নকলায়। ৫ ডিসেম্বর থেকে পাকসেনারা তল্পিতল্পা বেঁধে কামালপুর-বক্সিগঞ্জ থেকে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা হয়ে শেরপুর শহর দিয়ে জামালপুর অভিমুখে রওনা হয়।

অবশেষে ৭ ডিসেম্বর পূর্বদিগন্তে সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়লে মুক্তিযোদ্ধারা জয়বাংলা, জয়বাংলা স্লোগানে মুখরিত করতে এলাকায় ঢুকতপ থাকে, ক্রমেই স্লোগানের আওয়াজ স্পষ্ট হয় কেটে যায় শংঙ্কা। মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে মুক্তির উল্লাসে মেতে উঠে সবাই। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীরা এগিয়ে যায় সামনের দিকে আর পিছু হটে হানাদার বাহিনী শত্রুমুক্ত হয় শেরপুর।



বিষয়:



এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top