ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন সময়;

নিরাপত্তাহীনতায় পর্যটনকেন্দ্র গজনী অবকাশ

শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন | প্রকাশিত: ১৪ মার্চ ২০২১ ১৭:২২; আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৫:৫৫

ছবিঃ সংগৃহীত
"গজনী অবকাশ" নামটির সাথে আমার শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি জড়িত, তাই যখনি গজনী অবকাশ কথাটি আসে, আমি আমার স্কুলের দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করি। আমার ছোটবেলার স্কুল ছিলো আদর্শ বিদ্যাপীঠ। এখান থেকেই আমার শিক্ষাজীবন শুরু। প্রতিবছর আমাদের স্কুল থেকে যে বনভোজনের আয়োজন করা হতো, সেটি গজনী অবকাশ অথবা মধুটিলা ইকোপার্কেই সীমাবদ্ধ থাকতো। কারনটি হয়তো এমনও হতে পারে, ছোট ছেলেমেয়ে এবং অভিভাবকদের নিয়ে দূরের ভ্রমণ কিছুটা অনিরাপদ এবং এতে অনেকেই অনুৎসাহী হতে পারে। তাই নিজ জেলাতেই এমন নয়নাভিরাম গাড়োপাহাড়ে আমরা প্রতিবছরই যেতাম।
 
যাই হোক, বনভোজনের বাস যখন ঐ শাল বৃক্ষের আচ্ছাদন আর পাহাড় কেটে তৈরি করা রাস্তায় প্রবেশ করতো, আমরা রীতিমতো লাফালাফি শুরু করে দিতাম। পাহাড়ী লাল হলুদ মাটি, গারো দের মাটির ঘর, গজনীর মৎসকুমারী এসব দেখতে দেখতে আমাদের বাস গজনীতে প্রবেশ করতো এবং আমরা নেমে পাহাড়ে ঘুরতে বেরোতাম। তখন গজনীতে এত পাকা সিড়ি ছিলো না এবং এত দোকানপাটও ছিলো না। সময় ও জীবিকার পরিবর্তনে হয়ত দোকানপাট এখন বেড়েছে। আমার একটি কথা স্পষ্ট মনে আছে, শুধু বাঘের গুহা আর টাওয়ার ছাড়া আর কোথাও কোনো চাদা দিতে হতো না। সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি হলো, তখন ঘুড়াও যেতো অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে। পাহাড়ী উচু নিচু রাস্তা, পাহাড় বেয়ে উপরে উঠা, নিচে নামা, শাল বৃক্ষের শুকনো পাতার মরমর শব্দে হেটে চলা খুবই উপভোগ্য ছিলো। বর্ডারের সীমানার অনেক আগেই কিছু সতর্কমূলক সাইনবোর্ড বা পিলার ছিলো, আমরা ঐ পর্যন্ত নির্বিঘ্নেই যেতে পারতাম । এই পাহাড়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যারা আছে, তাদের সাথেও কথা বলা যেতো, ভাবের আদানপ্রদান ছিলো। এটা আমার অতীত অভিজ্ঞতা।
 
বলছি আজকের কথা, আজ আমরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরপুর জেলার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা মিলে গজনী যাই । অনেকবছর বাদে আজ ছিলো আমার গজনী যাত্রা । তাই বাস থেকে নেমেই সবাইকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে কয়েকজন ছোটভাইকে নিয়ে ঘুরতে বের হই। প্রথমত যে বিষয়টি আমার নজরে এসেছে, তা হলো গাড়ি রাখার পার্কিং জোনের ঐ পুরো এরিয়াটায় এত পরিমান সাউন্ড বক্স এবং তীব্র শব্দে গান বাজানো হয় যে ওখানে বসে বা দাড়িয়ে থাকা দায়। উদযাপনেরও কিছু ধরন আছে, সেটা অবশ্যই সীমার মধ্যে থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যই হলো শহুরে কোলাহল থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির মাঝে একটু সময় কাটানো। জীবনের একঘেয়েমী থেকে বের হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে একটি সুন্দর স্মৃতির সঞ্চয় করা। কিন্তু সেখানে গানবাজনার শব্দের তীব্রতা এতটাই যে, কোন পারিবারিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার পরিবেশ এখন সেখানে নেই । উপরন্তু দল বেধে উচ্ছৃঙ্খল ছেলেদের উৎপাতও দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
 
 
পিকনিক স্পট হয়ে আমরা টাওয়ারের পাশ দিয়ে নিচে নামার পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে একদম নিচে নেমে যাই এবং গজনীর ভেতরে যাওয়ার যে পীচঢালা রাস্তাটি, সেই রাস্তায় উঠি । কিন্তু রাস্তায় উঠেই আশ্চর্য হই একটি সাইনবোর্ড দেখে, যেখানে লিখাটা আমার কাছে একই সাথে ভীতিকর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বহীনতার প্রকাশ মনে হয়েছে । ওখানের লিখাটা ছিলো এমন "থামুন। এরপর যাবেন না, কাউকে ধরে নিয়ে গেলে আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।" লিখার মাঝে ছবি হিসেবে দেয়া হয়েছে ভীতিকর একটি চিত্র, যেখানে দুইজন সন্ত্রাসী একটি লোককে অস্ত্র হাতে ধরে আছে । পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পারলাম, কিছুদিন আগে এখানে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে ৷ আমার কথা হচ্ছে, এমতাবস্হায় পর্যটকদের সাবধান করার জন্য অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এগিয়ে আসতে হবে, কিন্তু সতর্ক করার ভাষাগুলো এমন কেন হবে! বর্ডারের আগ পর্যন্ত সীমা আমাদের, এই সীমার মাঝে আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের নয়! ধরে নিলাম ওখানে পাহাড়ী এলাকা। কিন্তু ঐ এরিয়াটুকুতে তো জনবসতি আছে এবং এতটাও গহীন বা দূর্ভেদ্য নয়, যেমনটা বান্দরবান রাঙামাটিতে দেখে আসছি। তাহলে এই যে ভাষাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে "ধরে নিয়ে গেলে আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই", এতে কি সন্ত্রাসীরা ভীত হবে নাকি ভেবে নিবে যে ধরে নেয়ার অপশন তো রাখায় হয়েছে!
 
বর্তমানে সাইনবোর্ডটি যে জায়গাটিতে রাখা আছে ঐটা একদম ই পিকনিক স্পট ঘেষা, মানে স্পটের বাইরে এক পা ও দেয়া যাবে না এমন! তাহলে সারাদেশ থেকে পর্যটকরা এসে ঐ লাউড স্পিকারে গানবাজনা আর বানানো কিছু প্রানীর ভাস্কর্য দেখেই চলে যাবে? আমরা যারা ঢাকায় থাকি, আমরা জানি আমাদের গাড়ো পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন জায়গার শিক্ষার্থীরা কতটা আগ্রহী। কিন্তু এমন একটি ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখলে এখানে কে আসবে? উপরন্তু বিভিন্ন জায়গায় চাদার বিরম্বনা তো আছেই । সবকিছু মিলিয়ে গজনীর বর্তমান চিত্র ও অবস্থা আমাদের পর্যটন খাতকে অনেক পিছিয়ে দিবে বলে আমি মনে করি। আমাদের জেলার ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে "পর্যটনের আনন্দে, তুলশীমালার সুগন্ধে।" আমাদের এই পর্যটনকে বাচিয়ে রাখতে হলে এবং দেশবাসীকে আরো বৃহৎ পরিসরে আমাদের পর্যটনের সম্ভাবনাময় গজনী ও মধুটিলাকে জানাতে হলে, অবশ্যই আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে । পর্যটকদের জন্য অবশ্যই সীমা নির্ধারন করা যেতে পারে, তবে সেটা এমন যেন না হয়ে যায় যে, স্পট থেকে বের হলেই জায়গায় জায়গায় এমন সাইনবোর্ড। জেলা প্রশাসনের কাছে আমার আবেদন, গাড়োপাহাড়ে যারা ভ্রমনে আসে, তাদের উচ্চ মাত্রার শব্দে গানবাজানো নিষিদ্ধকরন এবং গজনী অবকাশে সৃষ্ট এমন ভীতিকর পরিস্থিতির অবসান করে, আইনশৃঙ্খলা নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করে গজনী ও মধুটিলাকে পর্যটকবান্ধব একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক। এতে আমাদের শেরপুর উপকৃত হবে, আমাদের আইডেন্টিটি তৈরি হবে ।
লেখকঃ  শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠাতাঃ তুলশীমালা এক্সপ্রেস - Tulshimala Express




এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top